শূণ্য কথন

ইংরেজীতে একটা কথা আছে-Nothing lies at the heart of science, engineering and mathematics. আর সেই ‘নাথিং’ই হচ্ছে শূণ্য।

এই জগতের সবচেয়ে আলোচিত সংখ্যা ‘শূণ্য’। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে শূণ্য আমাদের ভবিষ্যৎ দেখতে সাহায্য করে। কিভাবে? আর কেনই বা শূণ্য এতো গুরুত্বপূর্ণ? এসব জানতে হলে আমাদের জানতে হবে শূণ্য জন্মের ইতিহাস আর তার নানান চড়াই-উৎরাইয়ের গল্প। কোনো রহস্যময় উপন্যাসের চেয়ে সেসব কম রোমাঞ্চকর নয়।

প্রাচীন সভ্যতা গুলোতে শূণ্য কেবলমাত্র একটা ধারণা ছিল। সুপ্রাচীন ব্যাবেলনিয়ান ও মায়ান সভ্যতায় ঋতু পরিবর্তনের হিসেব রাখার জন্য শূণ্যের ধারণার ব্যবহার হতো। আদি পন্ডিতেরা কোন সংখ্যার অনুপস্থিতি বোঝানোর জন্য শূণ্যের ধারণা ব্যবহার করতো। যেমন আমরা ১০১ অথবা ১০২ এ জাতীয় সংখ্যা গুলোতে মাঝখানে কোনো ১০ এর গুণিতকের অনুপস্থিতি বূঝানোর জন্য শূণ্য ব্যবহার করি। ব্যাবেলনিয়ান সভ্যতায় শূণ্য বোঝানোর জন্য দুটো ছোট তীরের মত চিহ্ন ব্যবহার করা হতো।

ছবি সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

যাই হোক, শূণ্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে প্রায় দুই সহস্রাব্দ সময় লেগে গেছে। আর শূণ্যের এই জন্ম হয়েছে প্রাচীন ভারতবর্ষে।

প্রখ্যাত গণিত লেখক এলেক্স ব্যালোসের মতে, শূণ্যের জন্মের জন্য ভারতের পরিবেশ ছিল একদম আদর্শ; “শূণ্যের ধারণা অনেক আগ থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতিতে একেবারে প্রোথিত আছে। ‘নির্বাণ’ এর কথাই ধরা যাক, এ হচ্ছে এক শূন্যতম অবস্থা-যেখানে কোনো জরা নেই, কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। তো শূণ্যের জন্য একটা প্রতীকই বা থাকবে না কেন?”

‘শূণ্য’ শব্দটি আজ একই সাথে কোনো কিছুর অনুপস্থিতি আর একটি পূর্ণাঙ্গ সখ্যা দুটোই বুঝায়।

আজকাল আমরা যেসব সংখ্যা ব্যবহার করছি সময়ের সাথে সাথে সেসবের আকার-আকৃতিতে বেশ পরিবর্তন এসেছে। শূণ্য এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। শূণ্য সবসময় একটা ছোট বৃত্ত দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে বৃত্ত দিয়ে একটা গর্ত বোঝানো হচ্ছে, যা মহাশূন্য বুঝায়। ভারতীয় রুপকথা অনুযায়ী শূণ্য বৃত্তাকার কারণ এটা জীবনচক্রকে প্রকাশ করে।

সপ্ত শতকের প্রাচীন ভারতে জ্যোতির্বিদ ব্রহ্মগুপ্ত প্রথম শূণ্যকে সংখ্যা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। শূণ্যকে কেবলমাত্র কোনো সংখ্যার অনুপস্থিতি বোঝানোর জন্য নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা হিসেবে এর যোগ, বিয়োগ আর গুনের ব্যাপারে ধারণা দেয়া হয়। শূণ্যের ভাগ তখনও সংজ্ঞায়িত করা যায় নি। এই শূণ্যের ভাগ সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে উন্মোচিত হয়েছে গণিতের আরও নতুন কিছু দিক। সেসব নিয়ে আমরা একটু পরেই আলোচনা করবো।

প্রাচীন ভারতে শূণ্য আবিস্কারের পর এর পরবর্তী বিকাশ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম বিজ্ঞানীদের হাতে এবং তখন থেকেই শূণ্য আরব্য সংখ্যা পদ্ধতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, কোথাও কোথাও ভারতীয়দের শূণ্য আবিস্কারের কৃতিত্ব অনৈতিকভাবে খর্ব করা হয়েছে। শূণ্যকে বরং আমাদের ইন্দো-এরাবিক সংখ্যা পদ্ধতির অংশ ধরা উচিত।

যাইহোক, দারুণ এক শুরুর পর শূণ্য আসল পরীক্ষার মুখোমুখি হলো। শূণ্য যখন ইউরোপে পৌঁছল তখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রীস্টানদের ধর্মযুদ্ধ চলছে। গণিত কিংবা অন্য যেকোন ক্ষেত্রে যেকোন আরব্য তত্ত্ব তখন ইউরোপে ব্রাত্য ছিল।

১২৯৯ সালে শূণ্য সহ সকল আরব্য সংখ্যা ফ্লোরেন্সে নিষিদ্ধ হলো। বলা হলো শূণ্য ব্যাবহারের ফলে প্রতারণা ছড়িয়ে যাওয়ার আশংকা আছে। দেখা গেল কোনো রিসিটে মূল দামের শেষে অতিরিক্ত শূণ্য যোগ করে দাম বাড়িয়ে দেয়া হলো!

এইসবের বিতর্কের পরেও একথা সত্য যে শূণ্যের আবিষ্কার একটা দারুণ ব্যাপার ছিল। শূণ্যের মাধ্যমে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক সখ্যার মধ্যে একটা সংযোগ খুঁজে পাওয়া গেল। আর এই ঋণাত্মক সংখ্যা ব্যাবহার করে ধার ও অর্থঋণের মত বিষয় সংজ্ঞায়িত করা সহজ হলো।

এর বহুকাল পর, পনের শতকের দিকে; তদ্দিনে বিলেতের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কয়েক শতক পার করে ফেলেছে আর চারিদিকে প্রিন্টিং প্রেসের চল শুরু হয়েছে; এমন সময়ে ইউরোপে শূণ্য সহ সকল আরব্য সংখ্যা আবার বরণ করে নেয়া হলো।

কোন সন্দেহ নেই যে শূণ্যের আবিষ্কার পরবর্তীতে বেশ কিছু অসাধারণ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও প্রযুক্তিগত পদ্ধতির ভিত গড়ে দিয়েছে। ১৭ শতকের দিকে ফরাসী দার্শনিক র‍্যনে দেকার্তে শূণ্যের ধারণার উপর ভিত্তি করে কার্টেসিয়ান স্থানাংক ব্যবস্থা আবিষ্কার করেন; যা আজও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ব্যালোস খুব সুন্দর করে বলেছেন: “শূণ্য সহ আরব্য সংখ্যা পদ্ধতির উদ্ভব এক রেনেসাঁর সূচনা ছিল। এর মাধ্যমে হিসাব-কিতাবের সাদাকালো জগত কেমন রঙিন হয়ে উঠলো।“

যাইহোক, এই রেনেসাঁর সময় শূণ্য আরও শক্তিশালী হয়ে উঠলো। যেমনটা আগে বলা হয়েছে শূণ্যের ভাগ আগে অসংজ্ঞায়িত ছিল। সেই ভাগের সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে সৃষ্টি হলো গণিতের এক চমৎকার শাখা-ক্যালকুলাস এর। ক্যালকুলাস হচ্ছে পরিবর্তনের গণিত এবং ক্যালকুলাসের সুক্ষ্ম কলাকৌশল ব্যবহার করে ইবোলা ভাইরাসের বিস্তার থেকে শুরু করে শেয়ার বাজারের উঠানামার ভবিষ্যত আমরা হিসেব করে বলে দিতে পারি। নিঃসন্দেহে ক্যালকুলাস গণিতের এক সেরা অস্ত্র।

এক প্যারায় সংক্ষেপে বলা যাক ক্যালকুলাস কিভাবে কাজ করে-সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় এমন একটা জিনিসের গ্রাফের কথা বিবেচনা করা যাক। ধরি সময়ের সাথে সাথে আপনি কতটুকু মনযোগ দিয়ে এই আর্টিকেলটা পড়ছেন সেটা গ্রাফে আঁকা হলো। যেহেতু সময়ের সাথে সাথে আমাদের মনযোগ পরিবর্তিত হয় তাই গ্রাফে উঠানামা থাকবে। কিন্তু যদি গ্রাফটাকে জুম করে দেখা যায় তাহলে গ্রাফের রেখা গুলো অনেকটা সরলরেখা মনে হবে। গ্রাফটাকে যদি আমরা আরও জুম করে শূণ্যের কাছাকাছি একটা অংশ বিবেচনা করি তাহলে যেকোনো ধরনের গ্রাফকেই একটা সুন্দর সরলরেখার মত মনে হবে। এইভাবে যেকোনো ধরণের গ্রাফ বিশ্লেষণ করা একদম সহজ।

শেয়ার বাজারের উঠানামা থেকে শুরু করে মানবদেহে ঔষধের বিস্তার এমন যা কিছু আছে যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় তার সবকিছুই ক্যালকুলাসের মাধ্যমে ব্যাখা করা যায়। শূণ্য সংখ্যা আবিষ্কার ছাড়া এসবের কিছুই সম্ভব ছিল না।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সংখ্যা শূণ্যের জয় হোক।

বিবিসি ফিউচার অবলম্বনে।

মূলঃ হান্নাহ ফ্রাই।

রুপান্তরঃ রিয়াজ মাহমুদ।